জীবনী

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনী | Netaji subhas Chandra Bose Biography in Bengali

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনী : সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ভারতের একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা, তিনি ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত কঠোর প্রচেষ্টা করেছিলেন।

ওড়িশার বাঙালি পরিবারে জন্ম নেওয়া সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন একটি ধনী পরিবারের ছেলে, কিন্তু তিনি তাঁর দেশকে খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁর সারা জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনী | Netaji Subhas Chandra Bose jiboni in Bengali

পুরো নামনেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু
জন্ম ২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭
জন্মস্থানকটক, উড়িষ্যা
বাবা -মাজানকীনাথ বসু, প্রভাবতী দেবী
স্ত্রীএমিলি (১৯৩৭)
কন্যাঅনিতা বোস
মারা যান ১৮ আগস্ট, ১৯৪৫ জাপান

সুভাষচন্দ্রের প্রাথমিক জীবন

সুভাষ চন্দ্র ওড়িশার কটকের একটি বাঙালি ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাঁর ৭ ভাই ও ৬ বোন ছিলেন। তিনি ছিলেন তার পিতামাতার নবম সন্তান, নেতাজি তার ভাই শারদচন্দ্রের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার বাবা জানকীনাথ ছিলেন কটকের একজন বিখ্যাত এবং সফল আইনজীবী, যাকে রায় বাহাদুর উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

নেতাজি ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব আগ্রহী ছিলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং তাঁর শিক্ষকের কাছে প্রিয়। কিন্তু নেতাজি কখনোই খেলাধুলায়  দিকে আগ্রহী ছিলেন না।

নেতাজি কটকের  স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে তিনি আরও পড়াশোনার জন্য কলকাতায় যান, সেখানে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনে বিএ করেন। এই কলেজে, নেতাজি একজন ইংরেজ অধ্যাপকের দ্বারা ভারতীয়দের নিপীড়নের বিরোধিতা করতেন, সেই সময় বর্ণবাদের বিষয়টি অনেকটা উত্থাপিত হয়েছিল। এই প্রথম নেতার মনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

নেতাজি সিভিল সার্ভিস করতে চেয়েছিলেন, ব্রিটিশ শাসনের কারণে সে সময় ভারতীয়দের সিভিল সার্ভিসে যাওয়া খুবই কঠিন ছিল, তারপর তার বাবা তাকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতির জন্য ইংল্যান্ডে পাঠান।

নেতাজি এই পরীক্ষায় চতুর্থ হয়েছিলেন, যেখানে তিনি ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। নেতাজি স্বামী বিবেকানন্দকে তাঁর গুরু বলে মনে করতেন, তিনি যা বলেছিলেন নেতাজি তা অনুসরণ করতেন ।

নেতাজির দেশের প্রতি অনেক ভালোবাসা ছিল, তিনি তার স্বাধীনতার জন্য চিন্তিত ছিলেন, যার কারণে ১৯২১ সালে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের চাকরি প্রত্যাখ্যান করে ভারতে ফিরে আসেন।

আরো পড়ুন : আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর জীবনী

সুভাষ চন্দ্র বসু রাজনৈতিক জীবন

ভারতে ফিরে আসার পর নেতাজি সঙ্গে সঙ্গে  স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেন। শুরুতে নেতাজি ছিলেন কলকাতার কংগ্রেস পার্টির নেতা, তিনি চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে কাজ করতেন। নেতাজি চিত্তরঞ্জন দাসকে তাঁর রাজনৈতিক গুরু বলে মনে করতেন।

১৯২২ সালে চিত্তরঞ্জন দাস মতিলাল নেহেরুর সঙ্গে কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং স্বতন্ত্র পার্টি, স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। চিত্তরঞ্জন দাস যখন তার দলের সাথে একত্রে একটি কৌশল তৈরি করছিলেন, তখন নেতাজি কলকাতার তরুণ, ছাত্র এবং শ্রমজীবী ​​মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ স্থান তৈরি করেছিলেন। তিনি ভারতকে যত দ্রুত সম্ভব স্বাধীন ভারত হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।

এখন মানুষ সুভাষচন্দ্র কে নাম দিয়ে চিনতে শুরু করল, তার কাজের আলোচনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। নেতাজি একটি তরুণ ভাবনা চিন্তা নিয়ে এসেছিলেন, যার কারণে তিনি একজন যুব নেতা হিসাবে বিখ্যাত হয়ে উঠছিলেন।

১৯২৮ সালে গুয়াহাটিতে কংগ্রেসের একটি বৈঠকের সময়, নতুন এবং পুরানো সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। নতুন তরুণ নেতারা কোন নিয়ম অনুসরণ করতে চাননি, তারা তাদের নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পুরনো নেতারা ব্রিটিশ সরকারের প্রণীত নিয়ম মেনে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

সুভাষচন্দ্র এবং গান্ধীর মতামত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেতাজি, গান্ধীজির অহিংস মতাদর্শের সাথে একমত ছিলেন না, তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল তরুণ, যারা সহিংসতায়ও বিশ্বাস করতেন। উভয়ের মতাদর্শ ভিন্ন ছিল কিন্তু উদ্দেশ্য এক ছিল, দুজনেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিল।

১৯৩৯ সালে, নেতাজি জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে গান্ধীজি পট্টভী সীতারাম্যকে দাঁড় করিয়েছিলেন, কিন্তু নেতাজি তাকে পরাজিত করেছিলেন।

গান্ধীজি এই পরাজয়ের কারণে দুঃক্ষ  পেয়েছিলেন। নেতাজি এটা জানার পর, অবিলম্বে তিনি তার পদ ত্যাগ করেছিলেন। ধারণার অসামঞ্জস্যতার কারণে নেতাজি জনগণের চোখে গান্ধীবিরোধী হয়ে উঠছিলেন, যার পরে তিনি নিজেই কংগ্রেস ত্যাগ করেছিলেন।

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA)

১৯৩৯ সালে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, তখন নেতাজি সেখানে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি সমগ্র বিশ্বের সাহায্য নিতে চেয়েছিলেন, যাতে ব্রিটিশদের উপর চাপ পড়ে এবং তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। এর কারণে ব্রিটিশ সরকারের উপর প্রভাব পড়েছিল, যার পরে ব্রিটিশ সরকার নেতাজিকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছিল।

তিনি জেলখানায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে খাবার খাননি এবং জলও পান করেননি। তার অবনতিশীল অবস্থা দেখে দেশের যুবকরা ক্ষিপ্ত হতে শুরু করে এবং তার মুক্তির দাবি শুরু করে।

তারপর সরকার তাকে কলকাতায় গৃহবন্দী করে রাখে। এই সময়ে, ১৯৪১ সালে, নেতাজি তার ভাগ্নে শিশিরের সাহায্যে সেখান থেকে পালিয়ে যান।

প্রথমে তিনি বিহারের গোমাতে যান, সেখান থেকে তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে যান। এর পরে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের মাধ্যমে জার্মানিতে পৌঁছান, যেখানে তিনি শাসক অ্যাডলফ হিটলারের সাথে দেখা করেন।

রাজনীতিতে যোগদানের আগে নেতাজি বিশ্বের অনেক জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন, সেজন্য তার দেশ ও দুনিয়ার ভালো অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল।

তিনি জানতেন হিটলার এবং জার্মানির শত্রু হল ইংল্যান্ড, তিনি ব্রিটিশদের প্রতিশোধ নেওয়ার এই কূটনীতি উনার কাছে যথাযথ লেগেছিলো এবং তিনিই শত্রুর শত্রুকে বন্ধু বানানো যথাযথ মনে হয়েছিল।

এই সময় তিনি অস্ট্রেলিয়ার এমিলিকে বিয়ে করেন, যার সাথে তিনি বার্লিনে থাকতেন, নেতাজি ও এমিলি একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিলেন। এই কন্যা সন্তানের নাম রাখলেন অনিতা বোস।।

১৯৪৩ সালে নেতাজি জার্মানি ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অর্থাৎ জাপানে চলে যান। এখানে তিনি মোহন সিংয়ের সাথে দেখা করেন, যিনি সেই সময় আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রধান ছিলেন। নেতাজি মোহন সিং এবং রাশ বিহারী বসুর সঙ্গে একত্রে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ পুনর্গঠন করেন। এর সাথে নেতাজি ‘আজাদ হিন্দ সরকার’ পার্টিও গঠন করেছিলেন।

১৯৪৪ সালে নেতাজি তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজে ‘তুমি আমাকে রক্ত ​​দাও, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেব’ স্লোগান দিয়েছিল। যা সারা দেশে নতুন বিপ্লব এনেছিল।

নেতাজীর ইংল্যান্ড সফর

নেতাজি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন যেখানে তিনি ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রেসিডেন্ট এবং রাজনৈতিক প্রধানের সাথে দেখা করেছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতা এবং তার ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন। এমনকি তিনি ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তেও অনেকটা মানিয়ে নিয়েছিলেন।

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু

১৯৪৫ সালে, জাপানে যাওয়ার সময় নেতাজির বিমান তাইওয়ানে বিধ্বস্ত হয়েছিল, কিন্তু তার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি, কিছু সময় পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

ভারত সরকার এই দুর্ঘটনা নিয়ে বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল, কিন্তু আজও এটি নিশ্চিত করা যায়নি। ১৯৫৬ সালের মে মাসে, শাহ নওয়াজ কমিটি নেতাজির মৃত্যুর রহস্য সমাধানের জন্য জাপানে গিয়েছিল, কিন্তু তাইওয়ানের সাথে কোন বিশেষ রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় তার সরকার সাহায্য করেনি।

২০০৬ সালে, মুখার্জি কমিশন পার্লামেন্টে বলেছিল, ‘নেতাজি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি, এবং রেনকোজি মন্দিরে রাখা তাঁর অস্থি নেতাজির নয়’ কিন্তু এটি ভারত সরকার প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজও এই বিষয়ে তদন্ত এবং বিতর্ক চলছে।

আরো পড়ুন : ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী

সুভাষ চন্দ্র বসু জয়ন্তী ২০২০

নেতাজী সুভাষজ চন্দ্র বসুর জন্ম ২৩ শে জানুয়ারি, তাই এই দিনটি প্রতি বছর সুভাষ চন্দ্র বসু জয়ন্তী হিসাবে পালিত হয়। এই বছর ২০২১ সালে, ২৩ জানুয়ারি তার ১২৩ তম জন্মদিন হিসাবে উদযাপিত হবে।

সুভাষ চন্দ্র বসু সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য

  • ১৯৪২ সালে, সুভাষ চন্দ্র বসু হিটলারের কাছে গিয়েছিলেন এবং তার সামনে ভারতকে স্বাধীন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু হিটলার ভারতকে স্বাধীন করতে আগ্রহী ছিলেন না এবং নেতাজীকে কোন স্পষ্ট কথা বলেন নি  ।
  • সুভাষ চন্দ্র বসু মুক্তিযোদ্ধা ভগৎ সিং কে বাঁচাতে চেয়েছিলেন এবং তিনি গান্ধীজিকে ব্রিটিশদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতেও বলেছিলেন, কিন্তু তিনি তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হন।
  • নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতীয় সিভিল পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিলেন, কিন্তু দেশের স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই আরামদায়ক চাকরিটিও ছেড়ে দেওয়ার একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
  • জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে নেতাজি খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন এবং তারপর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য নিজেকে আটকাতে পারেননি।।
  • ১৯৪৩ সালে নেতাজি বার্লিনে সফলভাবে আজাদ হিন্দ রেডিও এবং ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ১৯৪৩ সালেই আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্ক ১০ টাকার মুদ্রা থেকে ১ লক্ষ টাকার নোট জারি করেছিল এবং এক লক্ষ টাকার নোটে নেতা সুভাষ চন্দ্রের ছবিও ছাপা হয়েছিল।
  • নেতাজিই মহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতা বলে সম্বোধন করেছিলেন।
  • ১৯২১ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে সুভাষচন্দ্র বসু দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১১ বার বন্দি ছিলেন।
  • নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু দুবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু আজ পর্যন্ত একটি রহস্য রয়ে গেছে, আজ পর্যন্ত এই রহস্যের সমাধান হয়নি এবং এমনকি ভারত সরকারও এই বিষয়ে আলোচনা করতে চায় না।

FAQ

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছদ্মনাম কি ছিল ?

প্রাক্তন আইবি আধিকারিকেরা দাবি করেন যে, সাধক সারদানন্দ ছদ্মনামে বারাণসীর কাছে গুহায় থাকতেন নেতাজী।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মায়ের নাম কি ?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মায়ের নাম ছিল প্রভাবতী দেবী ।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাবার নাম কি

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পিতার নাম ছিল জানকীনাথ বসু ।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাণী কি ছিল ?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাণী ছিল ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’ ।

আরো পড়ুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!